

গতকাল যে ছেলেটাকে একেবারেই নিষ্পাপ ভেবে লাখো মানুষের কান্নায় পুরো ফেসবুক সয়লাব হয়ে গেছে, আজ ঠিক সেই ছেলেকে নিয়েই সবাই বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য দিচ্ছে! দুইটা সাইডই সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমরা কাউকে ঠিক যেমন দেখি সেরকমই জাজ করি। তার মানে এই নয় যে কেউ এসব লেখা দিয়ে খুন কিংবা হত্যাকে জাস্টিফাই করছে কিংবা করার চেষ্টা করছে!
অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়বদ্ধতা তুলে ধরছে সমাজ,সমাজের মানুষজন।আমরা আমাদের ক্যারিয়ার নিয়ে এতো ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে আমাদের ছেলে কিংবা মেয়ের জীবন যাপন পদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকি না।
ছেলেটার একাধিক ফেসবুক আই ডি, টিকটক আই ডি, ইন্সটা আই ডি দেখে একদিনেই আমাদের মনে তার প্রতি একটা আক্ষেপ,রাগ কিংবা আফসোস কাজ করছে।
তার টিকটক আই ডি তে যে টাইপের ভাষা,গান ইউজ করা হয়েছে তা দেখে কেউই তার পারিবারিক পরিবেশ কেমন ছিল তা ধারণা করতে পারবে না
নানা রঙের বাইকে নানা রকম এডাল্ট পোজে ছবি তোলা,মোবাইল আসক্তি থেকে অসৎ সঙ্গী সব কিছুই তার সাথে,তার বয়সের সাথে,পরিবেশের সাথে ছিল অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাবা মায়ের কি এতোটুকু ও সময় ছিল না যে ছেলেটা তার বয়সী ছেলেদের সাথে না মিশে,তার সহপাঠীদের সাথে না মিশে পাড়ার নেশাখোর বস্তির ছেলেদের সাথে মিশছে তা খোজ নেয়া?
নানা রঙের দামী বাইকগুলো বসে সে পোজ নিয়ে ছবি তুলছে,আপলোড দিচ্ছে!বাবা মায়ের চোখে কি কখনোই এসব পড়েনি?ছেলেটার টিক টক আই ডি তে যেসব শব্দ বা ভাষা সে ব্যবহার করেছে বিভিন্ন পোস্টে, এগুলো আমাদের কাছে খুব অবাক করার মতো বিষয় হলে ও বেশির ভাগ ছেলে মেয়ের কাছে এগুলো এখন স্বাভাবিক শব্দ।তারা তাদের বন্ধুদের সাথে এ ধরনের শব্দচয়ন খুব স্বাভাবিক ভাবেই করে থাকে। একেবারেই লাগামহীন!পরিবারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই!
বাবা মা হিসেবে এই দায় সর্বপ্রথম আমাদেরই।সন্তান যার হারায় সে বুঝে তার কি যায়!তাদের কষ্ট অন্য কেউ বুঝবে না,বুঝার কথা ও না।কিন্তু আমরা যদি আরেকটু সচেতন হই তাহলে হয়তো হাজারো অপ্রতীমকে বাঁচানো সম্ভব।
একটা বাচ্চা ছেলের তো এমন জীবন হওয়ার কথা ছিল না? ছেলেটা কে কেন আজ এমন নির্মমতার শিকার হতে হলো?
আজ অপ্রতীম- কাল অন্য কেউ কে রুখবে এই অনিয়ন্ত্রিত কিশোর সমাজকে?
বাবা মা হিসেবে আমাদের ভূমিকা কি আমরা প্রকৃতপক্ষে পালন করছি? সন্তানকে কি আমরা পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছি?ব্যস্ত বাবা মায়ের এমন শত শত অপ্রতীম এভাবেই একাকিত্ব থেকে বের হতে গিয়ে বিপথে চলে যাচ্ছে!আল্লাহ না করুন কখনো এর মধ্যে আমার বা আপনার সন্তান যদি পড়ে যায়!?
আমাদেরকে সচেতন হতে হবে সন্তানদের ধর্মীয়, নৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক,সাংস্কৃতিক,আবেগীয় সঠিক শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে।সন্তানদের শিক্ষা দেয়ার মধ্যেই শুধু তা সীমাবদ্ধ না রেখে নিজেদের জীবনাচরণে তার প্রভাব যেন পড়ে সে বিষয়ে ও আমাদের যত্নবান হতে হবে। তবেই সন্তান আমাদের অনুকরণ করবে।নিজেদের জীবনকে সুন্দর ভাবে গুছিয়ে রাখবে।
যদিও বর্তমান প্রজন্মের বেশির ভাগ সন্তানরা বাবা মায়ের আদর,শাসন কোনোটাকেই স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারে না।কিন্তু তবু আমাদেরকে ধৈর্য্যহারা হলে হবে না।বাবা মা হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সহনশীল ও ধৈর্য্যশীল হওয়া।ছেলে মেয়েরা বেপরোয়া হয়ে গেলে খুব স্থির হয়ে তাদের কে বুঝতে হবে, বুঝাতে হবে।তাদের আগলে রাখতে হবে, শাসন করতে গিয়ে আবার হিতে বিপরীত হয় কিনা সে বিষয় ও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, আবার অতিরিক্ত আহ্লাদী বানিয়ে আদর করে তার সব অন্যায় আবদার পূরণ করে তাকে নষ্ট করা যাবে না সে বিষয় ও মাথায় রাখতে হবে।একমাত্র সন্তান বলেই সব আবদার পূরণ করতে হবে,এ ধরনের মনোভাব ও সন্তানের ক্ষতিই করে থাকে।
সন্তানের বন্ধু নির্বাচন থেকে শুরু করে তার খেলার সহপাঠী,সত্য বলা সব দিকে বাবা মা কে সচেতন হতে হবে।কোনো পরিবর্তনীয় আচরণ চোখে পড়লে সন্তানকে মনিটরিং করতে হবে,প্রয়োজনে তার বাবা মাকেই তার জীবনের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হতে হবে,যেন তার মনের সব অস্থিরতা সে বাবা মা কে খুলে বলতে পারে অকপটে। তার জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
লেখক: নুরে রেজওয়ানা